Home ভারত ভারতের “কুম্ভমেলা” কে বিশ্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ হিসেবে ঘোষণা করলো ইউনেস্কো

ভারতের “কুম্ভমেলা” কে বিশ্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ হিসেবে ঘোষণা করলো ইউনেস্কো

SHARE

দক্ষিণ কোরিয়ার জিজু সিটি তে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের ১২ তম অধিবেশনে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও সাংস্কৃতিক কমিটি “কুম্ভ মেলা” কে বিশ্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ হিসেবে ঘোষণা করে।

 

গত বৃহঃস্পতিবার (07-12-2017) ভারতের বিদেশ মন্ত্রক (The External Affairs Ministry) এই তথ্য জানায়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটারে এক বার্তায় বলেন “এটি ভারতের জন্য অপার অানন্দ ও গর্বের বিষয়” (“A matter of immense joy and pride for India, ” Modi tweeted) হিসেবে অভিহিত করেন। অন্যদিকে ভারতের বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ও টুইট করে অানন্দ প্রকাশ করেন। ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য ও সংরক্ষণ কমিটি পৃথিবীর বৃহত্তম সনাতন হিন্দু ধর্মীয় জনসমাবেশ কে অসাম্প্রদায়িক, সহিষ্ণু, বৈষম্যহীন এবং সকল বর্ণ, জাতি নির্বিশেষে শান্তিপূর্ণ গণসমাবেশ হিসেবে বিবেচনা করেন।

কুম্ভমেলা সনাতনী হিন্দুদের ঐতিহাসিক উৎসব। এই পবিত্র মেলায় কোটি কোটি পূন্যার্থী হিন্দু ভক্তরা তীর্থস্নান করতে আসেন। বিশ্বের বৃহত্তম শান্তিপূর্ণ সমাবেশ হিসাবে ২০১৩ সালে এখানে ১০ কোটিরও বেশি মানুষের আগমন ঘটে। সাধারণত কুম্ভমেলা প্রতি চার বছর অন্তর আয়োজিত হয়। প্রতি ছয় বছর অন্তর হরিদ্বার ও প্রয়াগে (এলাহাবাদ) অর্ধকুম্ভ আয়োজিত হয়।প্রতি বারো বছর অন্তর প্রয়াগ, হরিদ্বার, উজ্জ্বয়িনী ও নাসিকে পূর্ণকুম্ভ আয়োজিত হয়। বারোটি পূর্ণকুম্ভ অর্থাৎ প্রতি ১৪৪ বছর অন্তর প্রয়াগে আয়োজিত হয় মহাকুম্ভ।

কুম্ভমেলা চারটি ভিন্ন ভিন্ন স্থানে আয়োজিত হয়। এই চারটি স্থান নির্বাচিত হয় বৃহস্পতি ও সূর্যের অবস্থান অনুসারে। বৃহস্পতি ও সূর্য সিংহ রাশিতে অবস্থান করলে নাসিকের ত্র্যম্বকেশ্বরে; সূর্য মেষ রাশিতে অবস্থান করলে হরিদ্বারে; বৃহস্পতি বৃষ রাশিতে এবং সূর্য কুম্ভ রাশিতে অবস্থান করলে প্রয়াগে; এবং সূর্য বৃশ্চিক রাশিতে অবস্থান করলে উজ্জয়িনীতে মেলা আয়োজিত হয়। সূর্য, চন্দ্র ও বৃহস্পতির রাশিগত অবস্থান অনুযায়ী মেলা আয়োজনের তিথি (তারিখ) নির্ধারিত হয়। ২০০৭ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাস নাগাদ ৪৫ দিন ব্যাপী সর্বশেষ অর্ধকুম্ভ আয়োজিত হয়েছে। সাত কোটিরও বেশি হিন্দু তীর্থযাত্রী প্রয়াগে এই মেলায় যোগ দেন। ১৫ জানুয়ারি মকর সংক্রান্তির দিন ৫০ লক্ষ মানুষ তীর্থস্নান করেন। ২০০১ সালে সর্বশেষ মহাকুম্ভে যোগ দিয়েছিলেন ছয় কোটি হিন্দু। এটিই ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বৃহত্তম জনসমাবেশ।

সম্প্রতি কুম্ভমেলা কে সাড়া জাগানো সংবাদটি হলো, ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপের থেকে অনেক সুষ্ঠ ভাবে আয়োজিত হয় কুম্ভ মেলা, মনে করেন হার্ভার্ডের গবেষকরা ব্রাজিলে আয়োজিত ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপের থেকে অনেক ভাল ব্যবস্থাপনা ছিল ২০১৩ সালে এলাহাবাদের কুম্ভ মেলায়। সম্প্রতি তাদের বই কুম্ভ মেলা-ম্যাপিং দ্য ইফেমেরাল মেগা-সিটি এমনটা দাবি করলেন হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির এক দল গবেষক। বইয়ের ৪৪৭ পাতায় মেলার ২৪ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে তৈরি কুম্ভ শহরের পরিকাঠামোকে তুলনা করা হয়েছে ম্যানহাটনের সঙ্গে। ইউনিভার্সিটির মোট ৫টি বিভাগ নগর পরিকল্পনা(urban planning), নাগরিক স্বাস্থ্য(public health), ব্যবসা(business), নির্মাণ(architecture), সংস্কৃতি(culture) বিভাগ কুম্ভমেলার ম্যাপিং করেছে। বইতে লেখা হয়েছে, “এত কম সময়ের মধ্যে যেভাবে একটি তাঁবুর শহর বানানো হয়, জনসংখ্যা বিচারে যা ম্যানহাটনের থেকে অনকে বড়, তা সত্যিই একটা বড় উদাহরণ।

যেভাবে ১০ কোটির বেশি মানুষ একটা ছোট জায়গায় ৫৫ দিন থাকেন, গঙ্গায় একসঙ্গে ৫০ লক্ষ মানুষ স্নান করেন, গঙ্গা-যমুনা-সরস্বতীর সঙ্গম, সাধুদের শিবির, গুরুদের একত্রে আসার মতো ঘটনা ঘটে তা সত্যিই দেখার মতো।” “…এখানে এক জায়গায় সবথেকে বেশি মোবাইল ব্যবহারেরও রেকর্ড রয়েছে। ৩৯ কোটি। যদি কেউ কুম্ভে মেলার মোবাইল ইউজারদের কল ডিটেল রিপোর্ট দেখেন তাহলে প্রতি সেকেন্ডে একটা করে ফোন করা হয়েছে। পুরো রিপোর্ট দেখতে ১২ বছর সময় লেগে যাবে। ৫০ দিনের বেশি সময়ে ১৪৬,৭৩৬,৭৬৪টি টেক্সট মেসেজ ও ২৪৫,২৫২,১০২টি কল করা হয়েছে।”

 

ভারত স্বপ্ন দেখে সকলের জন্য সমানাধিকারের। কুম্ভ মেলার ব্যবস্থাপনা সত্যিই একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে গবেষকরা দাবি করেছেন। ভারতবর্ষের বৈদিক সংস্কৃতি বহুত্ববাদের এক উজ্জ্বল নিদর্শণ। ত্রিবেনী সঙ্গম স্থলে স্নান করে পূন্য সঞ্চয়ের এই ধারণাটি এসেছে গুরুশিষ্য পরম্পরা ধারায় যা একসময় গুরুদেব শিষ্যকে বিভিন্ন অাচার, নৈতিকতা, অাধ্যাত্মিকতার শিক্ষা দিতেন নদী বা সমূদ্রের তীরে কিংবা পাহার বা পর্বতের গুহায়।

পরিশেষে, ভারতীয় উপমহাদেশের হিন্দু তথা পৃথিবীর সমগ্র সনাতনী হিন্দুদের জন্য এই সুসংবাদ অত্যন্ত গৌরবের। এর পূর্বেও মহর্ষি পতঞ্জলি কৃত যোগদর্শন থেকে উদ্ভূত “যোগ-ব্যায়াম” ২১ জুন বিশ্ব ইয়োগা ডে হিসেবে সারা পৃথিবীব্যাপি পালিত হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী যোগ অাজ সমাদৃত। বৈদিক ঋষি থেকে একালের মহাপুরুষদের ত্যাগ, নৈতিকতার শিক্ষা সারা পৃথিবীতে জনপ্রিয়। বিদেশী বর্বর শ্রেনীর শতশত অাক্রমন সত্ত্বেও সাম্রাজ্যবাদী চিন্তামুক্ত হিন্দু জাতি বিশ্বের সবচেয়ে সহিষ্ণু জাতির মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখার অব্যাহত প্রয়াস অাজও চালিয়ে যাচ্ছে। এটি অামাকে গর্বিত করে।

ভারতীয় বৈদিক দর্শনের প্রেম, প্রকৃতিপুজা, বৈচিত্রের মাঝে ঐক্যের সাধন, সর্বভূতে ঈশ্বর দর্শন হিন্দু জাতিকে মানবতাবাদী জাতি হিসেবে পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে সর্গবে দাড়াতে শেখায়।

~জয়ন্ত কর্মকার
(০৯-১১-১৭)

(ঋণস্বীকারঃ কলামটি লিখতে যাদের সাহায্য নিয়েছি তারা হলো, জিনিউজ ইন্ডিয়া, বিবিসি বাংলা, ইকোনোমিক টাইমস, ইন্ডিয়া এবং উইকিপিডিয়া বাংলা। ছবিঃ গুগল ইমেজ)