Home আজকের চট্টগ্রাম স্পেশাল জগৎজ্যোতি দাস : ইতিহাসের বীরশ্রেষ্ঠ

জগৎজ্যোতি দাস : ইতিহাসের বীরশ্রেষ্ঠ

SHARE

মাত্র ক’দিন আগের কথা, ৯ নভেম্বর আমার প্রিয় মানুষদের একজন বাসদ নেতা আফম মাহবুবুল হক চলে গেলেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা এই মানুষটিকে দেশে আনা হলোনা। আমার জানামতে, তাকে মুক্তিযোদ্ধার সনদপত্রও দেওয়া হয়নি। মুজিববাহিনীর এই প্রশিক্ষককে কানাডার মাটিতে শুয়ে থাকতে হলো। এর ফলে তার সহযোদ্ধারা বা দেশের মানুষ এমনকি তার কবরও জিয়ারত করতে পারবে না।

 

মাহবুবুল হককে আমি ১৯৬৮ সাল থেকে দেখে এটা নিশ্চিত জানি যে, এই দেশের কোন সুযোগ সুবিধা তিনি কোনদিন কোন আকারে গ্রহণ করেননি। দেশ তাকে কোন প্রতিদান না দিক অন্তত সম্মানটাতো তার প্রাপ্য। কিন্তু সেটি আমরা দিতে পারিনি। ১৯৬৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহম্মদ আলী জিন্নাহ হলে প্রবেশ করার পর থেকে যতোদিন তিনি ঢাকায় ছিলেন ততোদিনই একেবারে বড় ভাই বা অভিভাবক এর মতো মাথার ওপরে ছিলেন। সেই মানুষটি অপঘাতে প্রাণ হরালেন-তার বিচারও হলো না এবং কষ্টটা এখনও সামলাতে পারছিনা।

 

ব্যক্তিগতভাবে আমি মাহবুব ভাইয়ের কাছে এতো ঋণী যে এই অপারগতার দায় থেকে নিজেকে কোনভাবেই মুক্ত করতে পারছি না। আরও অনেক দায় থেকে এখনও নিজেকে মুক্ত করতে পারছি না। গত বছরের ১৬ নভেম্বর চলে গেলেন মুক্তিযোদ্ধা বন্ধু শেখ আব্দুল কাইয়ুম। ওর জন্যও কিছুই করতে পারিনি। যতবার মেয়ে ফারজানার সঙ্গে ওর ছবি দেখি ততবারই মনে হয় আমরা বন্ধু ও সহযোদ্ধাদের জন্য এমন কিছু করতে পারিনি যা আমাদের করা উচিত।
আরও একটি দায় নিজের কাঁধে আছে। একাত্তর সালের ১৬ নভেম্বর শহীদ হন জগৎজ্যোতি দাস। হাওর অঞ্চলের এ বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম জাতীয় স্তরের মানুষজনেরা জানেন বলে মনে হয় না। হাওরে এতো বড় যুদ্ধও আর হয়নি। তাকে যথাযথ রাষ্ট্রীয় সম্মানও আমরা দিতে পারিনি।

 

উল্লেখিত তিন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়েই আমি কিছু কথা লিখতে পারি। সময় পেলেই ওদেরকে নিয়ে আমি লিখবোও। আপাতত জগৎজ্যোতির ইতিহাসটা পড়ুন। মাহবুব ভাই আর কাইয়ুমের সঙ্গে আমার যতোটা গভীর সম্পর্ক ছিলো, জগৎজ্যোতির সঙ্গে তেমনটা ছিল না। তিনি আমার চেয়ে এক শ্রেণি ওপরে একই স্কুলে পড়তেন। আমার চাচাতো ভাই আব্দুল হান্নান ও দুই ভাগ্নে আবিদ ও হেলিম তার সহপাঠী ছিলো। আবিদ আজ আর নেই। তবে সে জগৎজ্যোতির গ্রামের বাড়ি জলসুখাতেই লজিং থাকতো। ওরা এক সঙ্গে স্কুলে আসতো। শুকনো মওসুমে এক সঙ্গে পায়ে হেটে আসতেন তারা। বর্ষায় আসতেন এক নৌকায়। দারুণ বন্ধুত্ব ছিলো ওদের। ওরা ১৯৬০ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর এক সঙ্গে পড়েছে।
আমরা স্কুল ছাড়ার আগের বছর তারা এসএসসি পরীক্ষা দেন। তবে আমার সঙ্গে জগৎজ্যোতির সম্পর্কটা স্কুলেই সীমিত নয়। বরং আরও গাঢ়। তিনি একাত্তর সালে যে যুদ্ধে শহীদ হন আমি সেই এলাকারই বাসিন্দা। আরও একটি বড় বিষয় হচ্ছে; আমি বাহাত্তর সালের জানুয়ারি মাসে জগৎজ্যোতির খুনী ও পলাতক রাজাকারদের আমার গ্রামের বাড়িতে আত্মসমর্পণ করিয়েছিলাম যাদেরকে শাল্লার মুক্তিযোদ্ধারা পরে হত্যা করে। আমি সেই ইতিহাসটি লিখবো।
জগৎজ্যোতি আমার গ্রামে বা তার পাশের গ্রাম কল্যাণপুরে সাধারণ মানুষের ভরসার কেন্দ্র হিসেবে আসা যাওয়া করতেন। আমাদের গ্রামের বাজার কৃষ্ণপুর ছিলো তাদের অস্থায়ী ক্যাম্পের মতো। হাসান মোরশেদ নামের একজন জগৎজ্যোতির ওপর একটি বই লিখেছেন- যার অংশ বিশেষ একটি অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে ফেসবুকে প্রকাশিত হয়। আমি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে হাসান মোরশেদের কাছ থেকে জগৎজ্যোতির যুদ্ধের ইতিহাসটি নিচ্ছি। আসুন একটু যুদ্ধের শুরুর বিবরণটি পাঠ করি।
‘সেদিন জগতজ্যোতির দলটা ছিল ৪২ জনের। খালিয়াজুড়ির কল্যাণপুর থেকে কয়েকটা নৌকায় মুক্তিযোদ্ধাদের এই দলটার মূল অপারেশন ছিল আজমিরীগঞ্জ পেরিয়ে বাহুবল গিয়ে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন উড়িয়ে দেওয়া। যাবার পথে মুক্তিযোদ্ধা সুবল দাসের দলকে সাহায্য করার জন্য ঘুঙ্গিয়ার গাও, শাল্লায় পাকিস্তান আর্মির সঙ্গে গুলি বিনিময় করেছে জ্যোতির দল। সেখান থেকে ভোরে রওয়ানা হয়ে সকাল নয়টায় ইউনিয়ন অফিসের সামনে হঠাৎ তাদের চোখে পড়ে রাজাকারদের নৌকা। তেলাপোকাগুলো নিরীহ জেলেদের নৌকা আটকে লুটপাট করছে। এক জেলে ইলিয়াসকে চিনতে পেরে আকুল স্বরে অনুনয় করলো, ও দাস বাবুর ভাই, আপনারা আমাদের বাঁচান।’
তৎক্ষণাৎ আক্রমণে সেখানেই কয়েকজন রাজাকার মারা যায়। বাকিরা দুই নৌকায় ইঁদুরের বাচ্চার মতো পালিয়ে আসতে থাকে। জ্যোতি বাকিদের অপেক্ষা করতে বলে বারোজন সঙ্গে নিয়ে তাড়া করেন সেই পলায়নপর তেলাপোকাগুলোকে। অন্যরা তার সঙ্গে আসতে চেয়েছিল, জগৎজ্যোতি ধমক দিয়ে বলেছে, কয়টা রাজাকার ধরতে সবার আসার কি দরকার?
নৌকা পাড়ে ভিড়িয়ে শুকনো বিল পেরিয়ে তেলাপোকাগুলো পালিয়ে যায় জলসুখার দিকে। জলসুখা জ্যোতির গ্রাম। নাড়িপোতা ঠিকানা। কিন্তু জ্যোতি তখন অপারেশনে, তাই কাছে এসেও ফিরে যান। যাবার সময় মর্টারের রেঞ্জে কাছাকাছি এক রাজাকারের বাড়িতে মর্টার শেলিং করে ওরা। ফেরার সময় হঠাৎই পাল্টে যায় সবকিছু। হঠাৎ চায়নিজ রাইফেলের গুলির আওয়াজ ভেসে আসে অনতিদূর থেকে। চায়নিজ রাইফেল পাকিস্তানিদের অস্ত্র, রাজাকারদের কাছে চায়নিজ রাইফেল থাকার কথা নয়। ওদের দৌড় বন্দুক পর্যন্তই। বিলের কাছে আসার পর ওরা দেখে, একদিকে আজমিরীগঞ্জ, অন্যদিকে শাল্লা ও মার্কুলির দিক থেকে গানবোটে করে পাকিস্তানী আর্মিরা এসে নদীর পাড়ে পজিশন নিচ্ছে।
ঠিক উল্টোদিকের বদলপুরেও গুলির আওয়াজ। রাজাকারগুলো ছিল আসলে ঘুঁটি, ওদের টোপ হিসেবে কাজে লাগিয়ে শেষ পর্যন্ত সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে পাকিস্তানিদের ত্রাস দাস পার্টিকে তিনদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে পাকিস্তান আর্মি। সুপ্রশিক্ষিত হিংস্র পাকি হায়েনাগুলো এতোদিন রোম ওঠা নেড়িকুকুরের মত সকাল-বিকাল মার খেয়েছে দাস পার্টির দুর্ধর্ষ গেরিলাদের হাতে, আজ তারা আটঘাট বেঁধেই এসেছে।
দুদিক থেকেই পাকিস্তান আর্মি পজিশন নেয় নদীর পাড় জুড়ে। আর জ্যোতির দলের ১২ জন পজিশন নেয় নদী আর শুকনো বিলের মাঝে। দূরত্বটা এতোই কাছে যে, পাকি জওয়ানদের পজিশন নেওয়ার জন্য অফিসারদের দেওয়া উর্দু কমান্ডও শুনতে পাচ্ছিলেন জগৎজ্যোতিরা। জ্যোতি আর তার সেকেন্ড ইন কমান্ড ইলিয়াস সামনের কলামে, দুজনের হাতেই মেশিনগান আর দুই ইঞ্চি মর্টার- এরপরের সারিতে মতিউর, রশিদ, আইয়ুব আলী, বিনোদ বিহারী বৈষ্ণব, ধন মিয়া, কাজল, সুনীল, নীলু, কাইয়ুম ও আতাউর। বিপরীতে অসংখ্য পাকিস্তানী সেনা। শুরু হলো মুখোমুখি যুদ্ধ।
মাত্র ১২ জন যোদ্ধা নিয়ে নিতান্তই এক অসম যুদ্ধে লিপ্ত জগৎজ্যোতির কণ্ঠ চিরে হঠাৎ বেরোয় এক অদ্ভুত উৎসাহের কথা, ‘চল, আজ শালাদের জ্যান্ত ধরবো, একেবারে হাতেনাতে।’ মৃত্যুভয়কে তুড়ি মেরে অকুতোভয় দুঃসাহসে যুদ্ধ করে যাওয়া ছোট্ট দলটায় তবুও ছোবল দিতে আপ্রাণ চেষ্টায় মাতে মৃত্যু। আইয়ুব আলীর মাথায় গুলি লাগে। তাকে দুজনের জিম্মায় দিয়ে পিছিয়ে বদলপুরের দিকে পাঠিয়ে দেন জ্যোতি। ভয়ংকর একপেশে সে যুদ্ধে একটু পর আহত হন আরেক মুক্তিযোদ্ধা। মাথার উপর চক্কর দিতে থাকে পাকিস্তান এয়ারফোর্সের ফগার, শিকারী হাউন্ডের মত। ওদিকে বদলপুরে থাকা মূল দলের বাকি ৩০ জনকে আটকে রাখে পাকিস্তানীদের আরেকটি দল। কোন সাহায্য পৌঁছায় না জ্যোতির দলের কাছে। দলের মাথাটা বাগে পেয়েছে আজ পাকিস্তানীরা, কেটে ফেলার প্রাণপণ চেষ্টা করে যায় তারা।


ক্রমশ কঠিন হয়ে যাওয়া যুদ্ধের এক পর্যায়ে ইলিয়াস জিজ্ঞেস করেন, ‘দাদা, কি করবো?’ নির্মোহ গলায় জ্যোতির শান্ত জবাব, ‘তোর যা খুশি কর।’ কমান্ডার যেন বুঝতে পেরেছিলেন এটাই তার শেষ যুদ্ধ। শেষ যুদ্ধ পরিচালনার ভার তাই প্রিয় সহযোদ্ধার কাঁধে দিয়ে জ্যোতি মন দেন নিখুঁত নিশানার দিকে। ফুরিয়ে আসতে থাকে গুলি। ইলিয়াস বিনোদ বিহারীসহ আরো দু-তিনজনকে পাঠান বদলপুর থেকে যেভাবেই হোক গুলিসহ রসদ আনার জন্য। বিকেল সাড়ে তিনটায় হুট করে গুলি লাগে ইলিয়াসের বুকের বাম পাশে। হাত দিয়ে দেখেন, কি আশ্চর্য, হৃদপিণ্ড ভেদ না করেই গুলি বেরিয়ে গেছে যেন কিভাবে। মাথার গামছা খুলে বুকের ক্ষতস্থান বেঁধে দিতে দিতে জ্যোতি জিজ্ঞেস করেন, ‘বাঁচবি?’
বুকে বুলেটের ক্ষত নিয়ে আহত ইলিয়াস জবাব দেন, ‘মনে হয় বাঁচতে পারি।’ কমান্ডার নির্দেশ দেন, ‘তবে যুদ্ধ কর।’ ১২ জন থেকে যোদ্ধার সংখ্যা এসে দাঁড়ায় পাঁচজনে। একটু পরে স্রেফ ইলিয়াস আর জ্যোতি ছাড়া আর কারোর অস্ত্র থেকে গুলির শব্দ শোনা যায় না। এমনকি জ্যোতির এলএমজির গুলি সরবরাহকারীও নেই আর। মধ্য নভেম্বরের দীর্ঘ বিকেলের সেই ক্লান্ত সময়ে এক অসম্ভব যুদ্ধে লিপ্ত হন দুই যোদ্ধা। ইলিয়াস গুলি লোড করতে থাকেন, আর জ্যোতি ১০০ গজ দূরে সারিবদ্ধ পাকিস্তানিদের গুলি করতে থাকেন অকুতোভয় তীব্রতায়। নিখুঁত নিশানায়, একটার পর একটা। মাথার উপর দিয়ে তীব্র গর্জন করতে করতে বেরিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তানীদের একটার পর একটা গুলি। তাতে বাঁধা দিতে মাঝে মাঝেই মর্টার থেকে শেলিং করছেন তারা। মনে ক্ষীণ আশা, সন্ধ্যা হয়ে গেলে হয়তো পাকিস্তানিদের ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া যাবে।
হায়, ওটুকু সময়ও দেয়নি সেদিন সন্ধ্যা হবার ঠিক আগে জ্যোতির মাথা ভেদ করে যায় এক আচমকা পাকিস্তানি বুলেট। গলাকাটা মহিষের মত ছটফট করে জ্যোতির শরীর। ইলিয়াস জড়িয়ে ধরেন তারে, ডাকেন, ‘দাদা, ও দাদা’। জ্যোতি একবার মাথা তোলেন, মাথা পড়ে যায়। যাবার আগে মাতৃভাষায় স্রেফ দুটো ক্লান্ত শব্দ উচ্চারিত হয় পাকিস্তানীদের সীমাহীন আতংক আর ভয়ের কারিগরের কণ্ঠ থেকে, ‘আমি যাইগ্যা’।
সেদিন কাঁদতে পারেননি, যুদ্ধক্ষেত্রে যোদ্ধাদের কাঁদার নিয়ম নেই যে! ইলিয়াস কাঁদেন ৪৩ বছর পর ২০১৫ সালের ২০ জুন স্বাধীন মাটিতে সেদিনের সেই যুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে। দাদার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে চিৎকার করে কাঁদেন দাদার জন্য। তার কমান্ডারের জন্য এ কান্না বড় শোকার্ত ও তীব্র আর্তনাদের। এ কান্না হৃদয়ের গহীন ভেতরের, বড় যন্ত্রণার।’ যুদ্ধের পরের কথাগুলো আরও পরে পাঠ করতে পারা যায়। জগৎজ্যোতির শহীদ হবার ছোট ইতিহাসটুকুর পরও আর বলার আছে। (চলবে)

মোস্তাফা জব্বার : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ ও কলাম লেখক।
mustafajabbar@gmail.com

সূত্রঃ খোলা কাগজ